অটোমান থেকে ইরান: বিশ্বাসঘাতকতার ১০০ বছর।

জীবন্ত মৃত্যু
0

মুসলিম উম্মাহর তেরোশ বছরের ইতিহাস কেবল বিজয়ের নয়, বরং এমন কিছু অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের গল্প যা কোনো বাহিরের শত্রুর পক্ষে কখনোই ঘটানো সম্ভব হতো না। ১৯১৬ সালে যখন অটোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ভাঙন ধরেছিল, তখন থেকে শুরু করে ২০১৬ সালে ইরানের বিতর্কিত আঞ্চলিক নীতি পর্যন্ত—প্রতিটি ট্র্যাজেডিতেই মুসলিমরা নিজেদের হাত দিয়েই নিজেদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।

অধ্যায় ০১: অটোমান খিলাফতের অন্তিম ঘণ্টা ও ব্রিটিশ ফাঁদ

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উসমানীয় খিলাফত ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্যের শেষ প্রতীক। কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানত, বাহির থেকে বোমাবর্ষণ করে এই বিশাল সাম্রাজ্যকে পঙ্গু করা যাবে না। তাই তারা প্রয়োগ করল 'জাতীয়তাবাদ' নামক মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র।

কেস স্টাডি: মক্কার শরীফ হোসেন বিন আলীর বিদ্রোহ (১৯১৬)

ঘটনা: ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমোহন মক্কার শরীফ হোসেনকে প্রলুব্ধ করেন যে, তিনি যদি সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তবে যুদ্ধ শেষে তাকে 'খলিফা' এবং আরবের বাদশাহ করা হবে।

বিশ্বাসঘাতকতা: শরীফ হোসেন এবং তার পুত্র ফয়সাল ব্রিটিশদের লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে খিলাফতের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ লাইন ধ্বংস করে দেন। এর ফলে ব্রিটিশরা সহজে দামেস্ক ও বাগদাদ দখল করতে সক্ষম হয়।

ফলাফল: ব্রিটেন তাদের কথা রাখেনি। বরং ১৯১৬ সালের 'সাইকস-পিকট' চুক্তির মাধ্যমে আরব বিশ্বকে নিজেদের কলোনিতে পরিণত করে এবং ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের জন্য উপহার হিসেবে প্রস্তুত করে।

অধ্যায় ০২: আফগানিস্তান ও পাকিস্তান— ওয়ার অন টেররের নেপথ্যে

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আফগানিস্তান ছিল একটি ক্ষতবিক্ষত জনপদ। কিন্তু ২০০১ সালের পর এই দেশটি মুসলিমদের অনৈক্যের সবথেকে বীভৎস মঞ্চে পরিণত হয়।

কেস স্টাডি: ২০০১ সালের মার্কিন আগ্রাসন ও পারভেজ মোশাররফের ভূমিকা

ঘটনা: নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা যখন আফগানিস্তানে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ আমেরিকার 'অবিচ্ছেদ্য বন্ধু' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

বিশ্বাসঘাতকতা: পাকিস্তান শুধু তাদের আকাশপথই খুলে দেয়নি, বরং মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে জ্বালানি ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে প্রতিবেশী মুসলিম দেশ আফগানিস্তানে বোমাবর্ষণে প্রত্যক্ষ সহায়তা দেয়। হাজার হাজার আফগান মুসলিমের রক্তের ওপর দিয়ে মোশাররফ সরকার ওয়াশিংটনের তুষ্টি অর্জন করে।

বিশ্লেষণ: এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিমদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধসে পড়ে এবং পাকিস্তান নিজেই অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে নিমজ্জিত হয়।

"আপনারাই কি সেই জাতি নন যারা ব্রিটিশের কলমে নিজেদের খিলাফতের মৃত্যু পরোয়ানা লিখেছিলেন? আপনাদের হাতই তো আজ প্রতিবেশী ভাইয়ের রক্তের গন্ধে ভারি।"

অধ্যায় ০৩: ইরান ও আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক মহাপ্রলয় (২০১৬)

আধুনিক কালে মুসলিম বিশ্বের সবথেকে বড় ভাঙনটি এসেছে ইরান বনাম আরব বিশ্বের ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তেহরান তাদের 'আঞ্চলিক আধিপত্য' বিস্তারের নেশায় এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যা মুসলিম উম্মাহর পিঠে ছুরিকাঘাতের সমান।

কেস স্টাডি: সিরিয়া ও ইরাকের রক্তাক্ত রূপান্তর

ইরাক (২০০৩-২০১৪):

আমেরিকা যখন সাদ্দামকে সরাতে চাইল, ইরান পর্দার আড়াল থেকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল সুন্নি শাসনের পতন ঘটিয়ে ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়াদের ক্ষমতায় বসানো।

সিরিয়া (২০১১-২০১৬):

বাশার আল-আসাদকে বাঁচাতে ইরান রাশিয়ার বিমান হামলাকে আমন্ত্রণ জানায়। হিজবুল্লাহ এবং ইরানি কুদস ফোর্সের সহায়তায় সিরিয়ার সাধারণ সুন্নি মুসলমানদের ওপর যে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়, তা আধুনিক ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।

ইয়েমেন ও লেবানন:

হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে ইয়েমেনকে অস্থিতিশীল করা এবং হিজবুল্লাহর মাধ্যমে লেবাননকে কুক্ষিগত করা—এই প্রতিটি পদক্ষেপে ইরান মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে উসকে দিয়েছে।

কেন মুসলিমরাই মুসলিমদের ধ্বংসের কারণ?

ক্ষমতার অন্ধ মোহ বনাম উম্মাহর স্বার্থ

শরীফ হোসেনের বাদশাহ হওয়ার স্বপ্ন থেকে শুরু করে বর্তমানের স্বৈরশাসকদের গদি রক্ষার লড়াই—সবখানেই উম্মাহর সামষ্টিক স্বার্থ বলি দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনৈতিক ব্যবহার

শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে তেহরান এবং রিয়াদ তাদের রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে সাধারণ মুসলিমরা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদীদের 'Divide and Rule' নীতি

ব্রিটিশ থেকে আমেরিকান—সবাই জানে মুসলিমদের সরাসরি হারানো অসম্ভব। তাই তারা সবসময় মুসলিমদের একাংশকে অন্য অংশের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়।

উপসংহার: ইতিহাসের কাঠগড়ায় বর্তমান

আদহাম শাকাওয়ীর সেই তীক্ষ্ণ জবাব আজ মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের আক্ষেপ। ইরান যখন ফিলিস্তিনের দোহাই দিয়ে ইসলামী সংহতির কথা বলে, তখন সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে। পাকিস্তান যখন কাশ্মীরের কথা বলে, তখন আফগান সীমান্তে আফগান শিশুদের রক্তমাখা জামা উঁকি দেয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আমরা কখনোই অমুসলিমদের হাতে পরাজিত হইনি, যতক্ষণ না আমরা নিজেদের ভাইয়ের পিঠে ছুরিকাঘাত করেছি।

"নিজেদের নেকড়ে যখন নিজেরাই হই, তখন রাখালও আমাদের রক্ষা করতে পারে না।"

২০২৬ ওমর ডিজিটাল আর্কাইভ

HISTORY ARCHIVE GEOPOLITICAL ANALYSIS
ধন্যবাদ
Tags
  • Newer

    অটোমান থেকে ইরান: বিশ্বাসঘাতকতার ১০০ বছর।

Post a Comment

0 Comments

ধন্যবাদ, আপনার মন্তব্যের জন্য। আমরা আপনার সুস্বাস্থ্য ও সফলতা কামনা করি।

Post a Comment (0)
3/related/default