ইজরায়েলের ফিলিস্তিন দখলদারিত্ব এবং সেখানে মিলিটারি ইন্টারভেনশন এক ধরনের নতুন মোড় নেয় ২০০০ সালের পর যখন সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউবের প্রসার ঘটে। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা যখন সরাসরি ভিডিও প্রচার শুরু করেন, তখন ইজরায়েলি রাষ্ট্রযন্ত্র এক নতুন ধরণের 'ডিজিটাল যুদ্ধের' সূচনা করে। এই যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় 'ফ্যাক্ট চেকিং'।
১. ফরেনসিক মোহগ্রস্ততা: ২০১৩ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো কেস
২০১৩ সালে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত দুই শিশুর জানাজার একটি ছবি (পল হ্যানসেনের তোলা) ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো পুরস্কার পাওয়ার পর ইসরায়েলি ফ্যাক্ট-চেকাররা ফরেনসিক টুল ব্যবহার করে ছবির লাইটিং এবং ছায়ার মধ্যে অসঙ্গতি খোঁজা শুরু করে।
- তথ্যপ্রমাণ: মিডিয়া ক্রিটিক এদি কুন্টস্ম্যান এবং নৃতাত্ত্বিক রেবেকা স্টেইন তাদের 'Digital Militarism' বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে ইজরায়েলি সমাজ তখন হামলার শিকার শিশুদের নিয়ে আলাপের বদলে 'ছবির পিক্সেল' নিয়ে মেতে ছিল।
- ফলাফল: হারেতজ পত্রিকার হেডলাইন ছিল "A TIP: HOW TO RECOGNIZE A FAKE PHOTOGRAPH"। অর্থাৎ, মানুষের মৃত্যু ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে ছবির টেকনিক্যাল ত্রুটি।
"ফ্যাক্ট চেকিং যখন মানুষের যন্ত্রণার চেয়ে ফরেনসিক সত্যতাকে বড় করে দেখে, তখন তা নিপীড়নকে 'নরমালাইজ' বা স্বাভাবিক করে ফেলে।"
২. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: নিরাপদ সড়ক ও রাজনৈতিক আন্দোলন
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় শিশু-কিশোরদের ওপর যে ভয়াবহ দমন-পীড়ন চলেছিল, তার বয়ান মূলধারার মিডিয়ায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল। উল্টো সেখানে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায় 'গুজব'।
৩. আধুনিক হাতিয়ার হিসেবে ফ্যাক্ট চেকিং
বর্তমান সময়ে বন্যা পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও দেখা যায় একদল 'নিরপেক্ষ' ফ্যাক্ট-চেকারকে যারা ঠিক ইজরায়েলি বয়ানের মতো দাবি করেন— "ফ্যাক্ট-চেকিং না থাকলে দেশ গোল্লায় যাবে"। এই যে এক ধরণের 'জুজু' তৈরি করা, এটি আসলে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় পাবলিক অপিনিয়ন নিয়ন্ত্রণের আধুনিক উপায়।
কিভাবে এটি কাজ করে?
- স্টেপ ১: রাষ্ট্রীয় বা প্রভাবশালী বাহিনী কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটায়।
- স্টেপ ২: সেই ঘটনার ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ফ্যাক্ট-চেকাররা সেখানে ছোটখাটো কোনো ভুল খুঁজে বের করে।
- স্টেপ ৩: সেই ছোট ভুলটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরো অপরাধকেই 'গুজব' বা 'ফেইক' বলে প্রচার করা হয়।
- স্টেপ ৪: জনমত বিভাজিত হয় এবং অপরাধী রাষ্ট্রীয় বৈধতা পেয়ে যায়।
উপসংহার:
এই আলোচনা ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের গুরুত্বকে অস্বীকার করে না, বরং এর মাধ্যমে হওয়া রাষ্ট্রীয় বয়ান নির্মাণের সমালোচনা করে। যখন ফ্যাক্ট-চেকিং মানুষের জীবনের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারায় এবং কেবল পিক্সেল আর ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকে, তখন তা সমাজে ফ্যাসিজম এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সবচেয়ে শক্তিশালী 'সফট পাওয়ার' হিসেবে আবির্ভূত হয়।
লেখকের তথ্য: খন্দকার রাকিবের ২০২২ সালের প্রবন্ধের বিস্তারিত সংস্করণ।

ধন্যবাদ, আপনার মন্তব্যের জন্য। আমরা আপনার সুস্বাস্থ্য ও সফলতা কামনা করি।